অনলাইন ডেস্ক: দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) স্পষ্ট নির্দেশনা উপেক্ষা করে আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক বিতর্কিত চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর অনুসন্ধান বা তদন্ত করেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। উল্টো সালমান এফ রহমানের সরাসরি হস্তক্ষেপে ও স্বার্থ সুরক্ষায় ব্যাংকটিতে চেয়ারম্যান হিসেবে মেহমুদ হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের চরম অবক্ষয় ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কিভাবে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কুক্ষিগত করা হয়েছিল, এটি তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ বলেও ব্যাংখ খাত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর বিগত সরকারের বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বেনামি ঋণ, পাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাংকটিকে দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ নথিপত্র, ঋণের ফাইল ও সালমান এফ রহমানের একক সিদ্ধান্তে দেওয়া বড় বড় ঋণের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়। একইসঙ্গে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ একটি বিশেষ অডিট কমিটি গঠন করে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে, দুদকের এই নির্দেশনার পর দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও ব্যাংকটির তৎকালীন ও পরবর্তী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে কোনো অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান ফাইল খোলেনি। ব্যাংকের ভেতরে এখনো সক্রিয় থাকা সালমান এফ রহমানের বিশ্বস্ত একটি চক্র। এই তদন্ত প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি ফাইলচাপা দিয়ে রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আইএফআইসি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ব্যাংকটির সাবেক এমডি শাহ এ সারওয়ারের বিদায়ের পর সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সমীকরণে এবং সালমান এফ রহমানের একক পছন্দে মেহমুদ হোসেনকে ব্যাংকটির শীর্ষ পদে বসানো হয়েছিল।
মেহমুদ হোসেনকে নিয়োগ দেওয়ার মূল উদ্দেশ্যই ছিল সালমান এফ রহমান এবং বেক্সিমকো গ্রুপের স্বার্থ রক্ষা করা। নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে বেক্সিমকোর বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে কোটি কোটি টাকার ঋণ সুবিধা দেওয়া এবং আগের নেওয়া বিতর্কিত ঋণের পুনঃতফসিলিকরণ করাই ছিল এই নিয়োগের নেপথ্য কারণ।
সূত্রগুলো বলছে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সরকারের প্রতিনিধি ও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের অভিমত উপেক্ষা করে সালমান এফ রহমান নিজের একক ক্ষমতাবলে মেহমুদ হোসেনকে এমডি হিসেবে চূড়ান্ত করেন। সালমান এফ রহমানের সময়ে ব্যাংকিং নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে যেসব ঋণ দেওয়া হয়েছিল, মেহমুদ হোসেনের মেয়াদে সেগুলোর কোনো অডিট বা তদন্ত হতে দেওয়া হয়নি। মেহমুদ হোসেনের আমলে বেক্সিমকোর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি নামসর্বস্ব বা ‘শেল’ কোম্পানিকে বিপুল অঙ্কের ঋণ ছাড় করা হয়, যার কোনো বাস্তব জামানত ছিল না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক বা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ স্বাধীনভাবে তার তদন্ত করবে। কিন্তু আইএফআইসি ব্যাংকের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা দুদকের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সাবেক চেয়ারম্যানের আজ্ঞাবহদের বহাল তবিয়তে রাখা হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সালমান এফ রহমান জেলে থাকলেও ব্যাংকের ভেতরে তার তৈরি করা নেটওয়ার্ক এখনো ভাঙা সম্ভব হয়নি। মেহমুদ হোসেনের মতো কর্মকর্তাদের শীর্ষ পদে বসানোর মাধ্যমে ব্যাংকটিকে কার্যত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পকেটে পরিণত করা হয়েছিল, যার মাশুল এখন দিতে হচ্ছে সাধারণ আমানতকারীদের।
বর্তমানে আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ আকাশচুম্বী। দুদকের নির্দেশনার পরও সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ইনকোয়ারি না করায় ব্যাংকটির বর্তমান পর্ষদ ও আইনি বিভাগের সদিচ্ছা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে শুধু সালমান এফ রহমানকে গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়, বরং তার নির্দেশে বা সংযোগে মেহমুদ হোসেনসহ যারা ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসে আর্থিক ক্ষতিসাধন করেছেন, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা জরুরি। একই সাথে দুদকের নির্দেশনা অবমাননার দায়ে আইএফআইসি ব্যাংকের বর্তমান দায়িত্বরত কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা উচিত।
এ ব্যাপারে আইএফআইসি ব্যাংক (পিএলসি) চেয়ারম্যান মেহমুদ হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এছাড়া খুদে বার্তা পাঠালে তারও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মূখপাত্র আরিফ হোসেন খান এর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এছাড়া খুদে বার্তা পাঠালে তারও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
