স্টাফ রিপোর্টার: জনরোষের মুখে হাসিনা সরকারের পতনের পর আইএফআইসি ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠনের সময় চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ করা হয়েছে মেহমুদ হোসেনকে। এরপর থেকেই ব্যাংকটিতে চরম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংকটিতে মেহমুদ হোসেনকে চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়ার কারণে সুশাসনের চরম ঘাটতি দেখা হয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালাকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একজন বিতর্কিত ব্যাংকারকে চেয়ারম্যান পদে বসানোর পেছনে সুনির্দিষ্ট ও করপোরেট স্বার্থ কাজ করেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধান ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মেহমুদ হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা ও আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, এত অভিযোগ থাকার পরও তাকে কেন ‘ভাড়াটে চেয়ারম্যান’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২০২৬ সালের ৭ মে তার বিরুদ্ধে ৩ হাজার ৬১৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ, অর্থপাচার ও দুর্নীতির অভিযোগ দুদকে দাখিল করা হয়েছে। মগবাজার এলাকার বাসিন্দা মো. আইয়ুব হোসেন দুদকের প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে এই অভিযোগ দাখিল করেন। এর আগে গত ১১ মার্চ তিনি একই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছেও আবেদন করেছিলেন।
খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান, মেহমুদ হোসেনের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে বিভিন্ন ব্যাংকে শীর্ষ পদে থাকাকালীন ক্ষমতার অপব্যবহার, বেনামি ঋণ অনুমোদন ও আর্থিক জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তার নাম দুদকের একাধিক মামলা ও তদন্তাধীন তালিকায় থাকার পরও তাকে আইএফআইসি ব্যাংকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের পরিচালক বা শীর্ষ পদে এমন কোনো ব্যক্তি বসতে পারেন না যার বিরুদ্ধে গুরুতর আর্থিক কেলেঙ্কারি বা ফৌজদারি মামলা চলমান রয়েছে। কিন্তু মেহমুদ হোসেনের ক্ষেত্রে এই নিয়ম পুরোপুরি লঙ্ঘন করা হয়েছে, যা ব্যাংকটির সাধারণ আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক এমডি থাকার সময়ই মেহমুদ হোসেনের ভূমিকা নিয়ে ব্যাংকিং পাড়ায় নানা গুঞ্জন ছিল। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর যখন ধারণা করা হয়েছিল ব্যাংকে সুশাসন ফিরবে, ঠিক তখনই এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তড়িঘড়ি করে ব্যাংকটির পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ব্যাংকটির বড় একটি অংশীদারিত্বের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী মহল—বিশেষ করে বেক্সিমকো গ্রুপ এবং বিগত সরকারের সুবিধাভোগী চক্র—ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকার বেনামী ঋণ ও অর্থ পাচারের তথ্য ধামাচাপা দিতে একজন ‘অনুগত’ ব্যক্তির সন্ধান করছিল। মেহমুদ হোসেনের পূর্ববর্তী রেকর্ড এবং ব্যাংকের ভেতরের দুর্বলতাগুলো সম্পর্কে জানাশোনা থাকার কারণে তাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফল হিসেবে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার ক্ষুণ্ন করে পর্ষদের বাকি সদস্যদের পাশ কাটিয়ে ২০২৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তাকে চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসানো হয়।
দুদকে জমা পড়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের আগে ব্যাংকটি লাভজনক অবস্থায় থাকলেও মেহমুদ হোসেন আসার পরবর্তী তিন মাসে প্রায় ১৯১ কোটি টাকা লোকসান হয় এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৫৬০ কোটি টাকায়। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৮ মাসে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সমন্বয়ে ব্যাংকটি থেকে মোট ৩ হাজার core ১৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই অভিযোগে চেয়ারম্যান মেহমুদ হোসেনসহ আরও ৬ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন— ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদ, হেড অব ইন্টারনাল কন্ট্রোল অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স মো. মুজাহিদুল কবির, হেড অব কার্ড ও ডিজিটাল ব্যাংকিং জামির হোসেন, চিফ ডেস্ক অফিসার মো. রাশিদুল কবির রাজীব, হেড অব ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট আব্দুল্লাহ আল হাফিজ এবং লোকাল অফিসের শাখা ব্যবস্থাপক আশরাফুল আলম। এছাড়া বোর্ডের কিছু অজ্ঞাত পরিচালক ও সহযোগীদের বিরুদ্ধেও এতে অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগের বিবরণী থেকে জানা যায়, দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন-১৯৪৭ এর ৫(২) ধারা, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর ৪ ও ৫ ধারা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর আওতায় এই তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগে মেহমুদ হোসেনের পূর্ববর্তী কর্মজীবন নিয়েও মারাত্মক প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তিনি ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালীন সেখানে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় দুদকের একাধিক মামলায় তার নাম এলেও পরবর্তী সময়ে প্রভাব খাটিয়ে তিনি এজাহার থেকে নিজের নাম বাদ দিতে সক্ষম হন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। তবে ২০২৪ সালের একটি মামলার এজাহারেও মেহমুদ হোসেনের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এছাড়া, ব্যাংক এশিয়ায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রাইম ব্যাংকের কয়েকটি বড় ঋণ টেকওভার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পাওয়ায় ব্যাংক এশিয়ার বোর্ড তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছিল বলেও অভিযোগে জানা গেছে।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, মেহমুদ হোসেন আইএফআইসি ব্যাংকের একজন স্বাধীন বা পেশাদার চেয়ারম্যান নেন, বরং তিনি নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাকারী ‘ভাড়াটে চেয়ারম্যান’। তার মূল অ্যাসাইনমেন্ট হলো—বিগত বছরগুলোতে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে বেনামি ও ভুয়া কোম্পানির নামে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট ও বিদেশে পাচার হয়েছে, সেগুলোকে আইনি বৈধতা দেওয়াসহ খেলাপি ঋণের প্রকৃত খতিয়ান আড়াল করা। সাবেক চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের সময়কার অনিয়ম তদন্ত না করে বরং তাকে সহযোগিতা করা এবং সালমান এফ রহমান ও শিকদার গ্রুপের রিক ও রনের নামে-বেনামে থাকা ঋণসংক্রান্ত বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পাঁচ দিন পর, ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর মেহমুদ হোসেন ব্যাংকের সব শাখায় নিজের ছবি ও বাণী টাঙানোর নির্দেশ দেন, যা ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ এর ১৫ ধারার স্পষ্ট লঙ্ঘন।
এছাড়া ট্রেজারি প্লেসমেন্টের অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে তিনি একক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং আইএফআইসি লন্ডনের লোকসানি এক্সচেঞ্জ হাউজ পরিদর্শনের নামে ১১ সদস্যের একটি দল নিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে প্রমাণিত হলেও সংশ্লিষ্ট অর্থ ফেরত দেওয়া হয়নি।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, চেয়ারম্যানের নির্দেশে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি “লুটপাটকারী চক্র” গঠন করা হয়েছে, যারা অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল করে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ করছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কবির আহমেদের বিরুদ্ধে ডিএমডি শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদের মাধ্যমে নিয়মিত মাসোহারা বা অর্থ প্রদানের বিনিময়ে এসব অনিয়মকে বৈধতা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণের বিষয়ে বলা হয়েছে, মেহমুদ হোসেন অবৈধ সুবিধার অর্থ অস্ট্রেলিয়ায় পাচার করে সেখানে পরিবারের জন্য বাড়ি ও ফ্ল্যাট কিনেছেন এবং ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় নামে-বেনামে প্লট ও ফ্ল্যাট কিনেছেন। পাশাপাশি নিজের স্ত্রীকে দেশ জেনারেল ইনস্যুরেন্সের সিইও এবং ছেলে মাশরুর মাহমুদ শুভকে যমুনা ব্যাংকে এভিপি পদে নিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন।
এই বিষয়ে জানার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি কল রিসিভ করেননি। পরবর্তী সময়ে তাকে এসএমএস পাঠালেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দুদকের মামলায় নাম থাকা একজন ব্যক্তিকে একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে বসানো পুরো ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য একটি বিপজ্জনক নজির। এটি কেবল আইএফআইসি ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থকেই ঝুঁকিতে ফেলছে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে। অবিলম্বে এই অবৈধ ও অনৈতিক নিয়োগ বাতিল করে আইএফআইসি ব্যাংকে প্রশাসক নিয়োগ অথবা নিরপেক্ষ পর্ষদ গঠনের দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সার্বিক বিষয়ে জানতে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের সঙ্গে মুঠোফেনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। কল ব্যাকও করেননি। পরবর্তী সময়ে তাকে মোবাইলফোনে খুদে বার্তা পাঠালে তারও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
