অনলাইন ডেস্ক: আইএফআইসি ব্যাংক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে বলে দাবি করেছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মেহমুদ হোসেনের নীতি ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ন্যাশনাল ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করা এবং সিকদার পরিবারের রিক হক সিকদার ও রণ হক সিকদারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একটি কর্মকর্তাদের দলকে আইএফআইসি ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের ঘুষ ও অনিয়মের মাধ্যমে এসব কর্মকর্তাকে ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পদে বসানো হয়েছে। এতে ব্যাংকিং খাতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মেহমুদ হোসেন ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের আশ্রয় দিয়েছেন।
ন্যাশনাল ব্যাংকের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, ঋণ কেলেঙ্কারি, বেনামি ঋণ অনুমোদন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে আগে চিহ্নিত ও অপসারিত হওয়া বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে চেয়ারম্যানের আগ্রহে আইএফআইসি ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব নিয়োগে কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার পরিবর্তে ঘুষের পরিমাণ এবং ন্যাশনাল ব্যাংকে পূর্ব অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ, ব্যাংকের অন্যান্য অংশীজন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষা করে চেয়ারম্যান একক সিদ্ধান্তে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ঋণ ও মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্ব দিয়েছেন, যা ব্যাংকের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, রিক হক সিকদার ও রণ হক সিকদারের সময় ন্যাশনাল ব্যাংকের নীতিবহির্ভূত ঋণ অনুমোদনে এই কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এর ফলে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৭৬ শতাংশে পৌঁছে এবং লোকসান বেড়ে ৪ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
এছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ৭১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা পাচারের ঘটনায় প্রশাসনিক সহায়তার অভিযোগও এই চক্রের বিরুদ্ধে রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা চলমান বলে সূত্রের দাবি।
সূত্র আরও জানায়, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে সিকদার পরিবারের প্রায় ১০০ কোটি টাকার সম্পদ ও ২০৩টি ব্যাংক হিসাব জব্দ হওয়ার ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে কয়েকজন বর্তমানে আইএফআইসি ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন।
এদিকে আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ৭ হাজার ১২৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক অনুসন্ধান করছে। এ ঘটনায় উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল পারভেজ চৌধুরী ও শাহ মো. মইন উদ্দিনসহ ৩০ জন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।
পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক আইএফআইসি ব্যাংকে জরুরি ভিত্তিতে একজন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা ব্যাংকের ঋণ অনুমোদনসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাশনাল ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করা বিতর্কিত কর্মকর্তাদের আইএফআইসি ব্যাংকে নিয়োগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে। তাদের মতে, এ নিয়োগের প্রক্রিয়া ও অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত না হলে ব্যাংকটির ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে পাঠানো খুদে বার্তারও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
একইভাবে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি বা কলব্যাক করেননি। পরবর্তীতে পাঠানো খুদে বার্তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
