Home Seacond Lead তামাক নিয়ন্ত্রণে যুগান্তকারী অধ্যাদেশ কার্যকর

তামাক নিয়ন্ত্রণে যুগান্তকারী অধ্যাদেশ কার্যকর

by razu ahamed
০ comments


নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ সরকার জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে “ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫” জারি করেছে। গত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ (মঙ্গলবার) গেজেট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই অধ্যাদেশ কার্যকর হয়েছে। নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন আরও শক্তিশালী করা হয়েছে, বিশেষ করে ই-সিগারেট ও ভ্যাপের মতো নতুন নিকোটিন পণ্যের ক্ষেত্রে।

নতুন অধ্যাদেশে তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেট ও মোড়ক (প্যাকেজিং) সংক্রান্ত বিধানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেট ছাড়া কোনো তামাকজাত দ্রব্য বাজারজাত করা যাবে না। দ্রব্যের প্যাকেট, মোড়ক ও কৌটার আকার, আয়তন ও ওজন, তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যের সংখ্যা ও পরিমাণ, উৎপাদনের তারিখ এবং কুইটলাইন হেল্প নম্বর উল্লেখ করতে হবে। কেউ এই বিধান লঙ্ঘন করলে তাকে অনূর্ধ্ব এক মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৫,০০০ (পাঁচ হাজার) টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

ই-সিগারেট, ভ্যাপ, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট (HTP), নিকোটিন পাউচ এবং ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম (ENDS)–কে সরাসরি তামাকজাত দ্রব্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অধ্যাদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নিকোটিন গ্রহণে সহায়ক যেকোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্র—নিকোটিন থাকুক বা না থাকুক—এই আইনের আওতায় পড়বে। ফলে এতদিন যেসব পণ্য আইনগত ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বাজারে ছিল, সেগুলোর কার্যক্রম এখন পুরোপুরি নিষিদ্ধ।

নতুন আইন অনুযায়ী এসব পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিক্রয়, প্রদর্শন ও ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কেবল ব্যবহারকারী নয়, উৎপাদক ও বিক্রেতাকেও জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে।

এই অধ্যাদেশ নারী ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিক থেকেও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তামাক ও নিকোটিন ব্যবহারের কারণে নারীদের মধ্যে হৃদরোগ, শ্বাসযন্ত্রের রোগ, প্রজনন সমস্যা এবং গর্ভাবস্থায় জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে ই-সিগারেট ও ভ্যাপকে অনেক সময় “কম ক্ষতিকর” বলে প্রচার করে নারী ও শিশু-কিশোরীদের লক্ষ্য করে বাজারজাত করা হচ্ছিল। নতুন অধ্যাদেশ এই বিভ্রান্তিকর বার্তা বন্ধ করার একটি শক্ত আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে।

ধূমপানমুক্ত এলাকার পরিধি বাড়ানোও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে। সরকারি ও বেসরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গণপরিবহন, ইনডোর কর্মস্থল, শপিং মল ও রেস্তোরাঁসহ বহু স্থানকে ধূমপানমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি স্কুল, হাসপাতাল, খেলার মাঠ ও পার্কের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে কর্মজীবী নারী, গর্ভবতী নারী ও শিশুরা পরোক্ষ ধূমপানের ঝুঁকি থেকে আরও বেশি সুরক্ষা পাবে।

বিজ্ঞাপন ও প্রচারের ক্ষেত্রেও অধ্যাদেশটি কঠোর। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সিনেমা, নাটক ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে তামাক পণ্যের প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) কার্যক্রমেও তামাক কোম্পানির নাম বা লোগো ব্যবহার করা যাবে না। বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্য প্রদর্শনও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

তামাক বিরোধী নারী জোট (তাবিনাজ), জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো এই অধ্যাদেশকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এটি বাস্তবায়িত হলে তরুণ ও নারী জনগোষ্ঠীকে নিকোটিন আসক্তি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। তবে তাদের মতে, আইন কার্যকরের পাশাপাশি কঠোর মনিটরিং, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং ব্যাপক জনসচেতনতা কার্যক্রম নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
সার্বিকভাবে, এই অধ্যাদেশ বাংলাদেশকে একটি ধূমপান ও নিকোটিনমুক্ত ভবিষ্যতের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিল—যা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, স্বাস্থ্যব্যয় হ্রাস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

You may also like

Leave a Comment

যোগাযোগ

বার্তাপ্রেস একটি অনলাইনভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম। সত্য এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বার্তাপ্রেস পড়ুন, বার্তাপ্রেসে লিখুন। বার্তাপ্রেসের সঙ্গেই থাকুন।

ঠিকানা

© ২০২৫ | বার্তাপ্রেস কর্তৃক সর্বসত্ব ® সংরক্ষিত |