কুমিল্লা প্রতিবেদক: কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ৪নং শ্রীপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত ভিতরচরে ফুটবলকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এক অনন্য উৎসবমুখর পরিবেশ। ভিতরচর উদীয়মান ক্রীড়া সংগঠনের উদ্যোগে এবং কাতার প্রবাসী সমাজসেবক শাহ জালাল গাজীর পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত “শাহজালাল গাজী ডাবল হোন্ডা কাপ” ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে আগামীকাল শুক্রবার।
বিকাল ৩টায় ভিতরচর পূর্ব পাড়া সংলগ্ন বিশালাকার মাঠে মুখোমুখি হবে দুটি শক্তিশালী দল—মিয়াবাজার ফুটবল একাডেমি ও ডুমুরিয়া তরুণ জোট।
এই ফাইনাল ম্যাচকে ঘিরে শুধু ভিতরচর নয়, আশপাশের পুরো এলাকায় বিরাজ করছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। বৃহত্তর কুমিল্লার ফুটবল অঙ্গনে মিয়াবাজার ফুটবল একাডেমি ইতোমধ্যে প্রথম সারির ক্লাবগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে সামাজিক সংগঠন ডুমুরিয়া তরুণ জোটও দুর্দান্ত দল গঠন করে মাঠে নামছে। দুই দলের স্কোয়াডেই রয়েছে বিদেশি খেলোয়াড়, যা দর্শকদের আগ্রহ আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নকআউট পদ্ধতিতে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে শুরু থেকে ফাইনাল পর্যন্ত মোট আটটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিটি ম্যাচেই ছিল উপচে পড়া দর্শক, প্রাণবন্ত পরিবেশ এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ আয়োজন। সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হলো—পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যখন সারাদেশেই রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে, তখন চৌদ্দগ্রামে বিএনপি-জামায়াতসহ সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই টুর্নামেন্ট পরিণত হয়েছে এক রাজনৈতিক মিলনমেলায়। ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও মাঠের গ্যালারিতে সবাই এক কাতারে বসে উপভোগ করেছেন খেলা। স্থানীয়দের মতে, এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক রাজনৈতিক সহাবস্থানের ছবি।
আগামীকালের ফাইনাল ম্যাচে স্থানীয় গুণীজনদের সম্মাননা প্রদান করা হবে। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. জহিরুল ইসলাম পাটোয়ারী। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন ভাটরা কালজয়ী বিদ্যানিকেতনের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি এম এ মতিন এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আলমগীর হোসেন। টুর্নামেন্টের শুরু থেকে প্রতিটি ম্যাচেই স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যা শিক্ষিত সমাজের প্রতি এই আয়োজনের বিশেষ সম্মান ও মূল্যায়নেরই প্রতিফলন।
ফাইনাল ম্যাচে সভাপতিত্ব করবেন স্থানীয় সমাজসেবক মো. আবু ইউসুফ। স্থানীয়রা বলছেন, চৌদ্দগ্রামে এই প্রথম এমন একটি আয়োজন দেখা গেল যেখানে শিক্ষিত সমাজ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সাধারণ মানুষ সবাই একত্রিত হয়েছেন খেলাধুলার মঞ্চে। তাদের মতে, এভাবেই যদি নিয়মিত ক্রীড়া আয়োজন করা যায়, তাহলে এলাকার যুবসমাজ মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে থাকবে, গড়ে উঠবে একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজ। রাজনৈতিক প্রতিহিংসাও ধীরে ধীরে কমে আসবে।
এই পুরো আয়োজনের নেপথ্যের প্রধান কারিগর প্রবাসী শাহজালাল গাজী। প্রবাসে থেকেও যিনি নিজ এলাকার সমাজ ও যুবসমাজ নিয়ে গভীরভাবে ভাবেন। স্থানীয়দের ভাষায়, সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতেই তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করে এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন। তার এই মানবিক দর্শনের পেছনে রয়েছে পারিবারিক প্রেরণাও। তার পিতা সমাজসেবক মো. আবু ইউসুফ দীর্ঘদিন ধরেই এলাকার উন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তনে কাজ করে যাচ্ছেন। ফলে শাহজালাল গাজীর এই উদ্যোগ স্থানীয়দের কাছে আরও বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
শুধু টুর্নামেন্ট আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নন শাহজালাল গাজী। তার পৃষ্ঠপোষকতায় শ্রীপুর ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলার একঝাঁক শিক্ষিত তরুণ প্রবাসে থেকেও এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। বন্যাসহ যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে তারা নিঃস্বার্থভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন অসহায় মানুষের। এই মানবিক কর্মকাণ্ডের নেতৃত্বে রয়েছেন ভাটরা সমাজ কল্যাণ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নুরুল আলম, ভিতরচর গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেন, হায়দার মজুমদার, মঞ্জুরুল হাসান রিপন, আব্দুস সালাম, বসুয়ারা গ্রামের মোজাম্মেল হোসেন সুজন, মোস্তফা কামাল, পাইকোটা গ্রামের আল আমিন মজুমদারসহ আরও অসংখ্য তরুণ।
স্থানীয়দের কণ্ঠে এখন একটাই কথা—শাহজালাল গাজীর মতো মানুষের উদ্যোগই পারে সমাজকে বদলে দিতে। খেলাধুলা, শিক্ষা, মানবিকতা আর রাজনৈতিক সৌহার্দ্যের এমন সম্মিলন চৌদ্দগ্রামের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আগামীকালের ফাইনাল ম্যাচ তাই শুধু একটি খেলা নয়, এটি একটি সুন্দর ও ঐক্যবদ্ধ সমাজ গড়ার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
