Home অন্যান্য পারিবারিক প্রভাব ও কমিশন বাণিজ্যসহ গুরুতর অভিযোগ আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেহমুদের বিরুদ্ধে

পারিবারিক প্রভাব ও কমিশন বাণিজ্যসহ গুরুতর অভিযোগ আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেহমুদের বিরুদ্ধে

by razu ahamed
০ comments

জয় চক্রবর্তী/শামীম মণ্ডল: দীর্ঘদিন ধরে নানামুখী ঋণ জালিয়াতি ও অব্যবস্থাপনার ভারে জর্জরিত আইএফআইসি ব্যাংক। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর যখন ব্যাংকটির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হয়, তখন গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু সেই স্বস্তির রেশ কাটতে না কাটতেই এখন খোদ ব্যাংকের ভেতর থেকেই আসছে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও নীতিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ। ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যাংকটির দৈনন্দিন পরিচালনায় ‘অযাচিত হস্তক্ষেপ’ এবং নিজের সুবিধামতো প্রতিষ্ঠানকে পারিবারিক কমিশণ বাণিজ্যের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকের চেয়ারম্যানের প্রধান কাজ হলো নীতি নির্ধারণ এবং পর্ষদ সভায় সভাপতিত্ব করা। ব্যাংকের দৈনন্দিন নির্বাহী কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার কোনো আইনি অধিকার তার নেই। অথচ, আইএফআইসি ব্যাংকের শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, চেয়ারম্যান সরাসরি তাদের সঙ্গেঅনলাইন মিটিং করছেন এবং শাখা পরিচালনায় এমন সব নির্দেশনা দিচ্ছেন যা ব্যাংকিং প্রথা ও আইনের পরিপন্থী।

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একটি চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে যে, চেয়ারম্যান কর্মীদের পদোন্নতি ও বদলির বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছেন। এর ফলে সাধারণ কর্মীরা চরম মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞ মহলের মতে, একজন চেয়ারম্যান যখন নির্বাহী এমডি বা কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন, তখন ব্যাংকের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে এবং সুশাসনের অভাব দেখা দেয়।

আইএফআইসি ব্যাংকের বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি উঠেছে ‘স্বার্থের সংঘাত’ বা কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকটির বৃহৎ ঋণ বা এলসি খোলার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে সাধারণত গ্রাহকের ইচ্ছানুযায়ী বা মুক্ত বাজার প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে বীমা কোম্পানি নির্বাচন করার কথা। কিন্তু আইএফআইসি ব্যাংকের ক্ষেত্রে একটি ‘অলিখিত নিয়ম’ চালু করার অভিযোগ রয়েছে, যেখানে ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বীমা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইন্স্যুরেন্স না করলে সংশ্লিষ্ট শাখা ব্যবস্থাপকের ওপর শাস্তিমূলক বদলির খড়গ নেমে আসে।

এই ধরনের কর্মকাণ্ড সরাসরি করপোরেট সুশাসনের লঙ্ঘন। যদি কোনো চেয়ারম্যান বা তার পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেব্যাংকের ব্যবসায়িক যোগসাজশ থাকে, তবে সেটি স্বচ্ছতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। ব্যাংকিং ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো গ্রাহকের আস্থা। সেই আস্থার জায়গায় যখন নিজস্ব কমিশন বাণিজ্য বড় হয়ে দেখা দেয়, তখন ব্যাংকের সম্পদ ঝুঁকিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

আইএফআইসি ব্যাংক ইতোমধ্যেই খেলাপি ঋণের এক বিশাল পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই নাজুক পরিস্থিতি থেকে ব্যাংকটিকে উদ্ধার করার জন্য প্রয়োজন ছিল কঠোর পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতা। কিন্তু সেখানে যদি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ব্যক্তিগত এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা হয়, তবে ব্যাংকটির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়বে।

ব্যাংকখাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, আইএফআইসি ব্যাংকের মতো একটি সংবেদনশীল আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের কর্মকাণ্ড কেবল অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নষ্ট করছে না, বরং বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আস্থার সংকট তৈরি করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত, এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা। শুধুমাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, বরং ব্যাংকের অডিট রিপোর্ট এবং ভেন্ডর তালিকার লেনদেন বিশ্লেষণ করলেই এই ‘কমিশন বাণিজ্য’-এর সত্যতা বেরিয়ে আসবে।

একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি এবং সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ যেখানে মূল চালিকাশক্তি, সেখানে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যবসায়িক স্বার্থের কোনো স্থান থাকতে পারে না। আইএফআইসি ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, ব্যাংকটির শুদ্ধিকরণের প্রক্রিয়াটি কেবল নিয়োগের পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং যে কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা জরুরি। চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের উচিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া এবং ব্যাংকিং আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল হয়ে প্রতিষ্ঠানের সুশাসন নিশ্চিত করা। নতুবা আইএফআইসি ব্যাংকের জন্য সামনে বড় ধরনের বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান-এর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেন। তবে প্রতিবেদকের পরিচয় জানার পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

সার্বিক বিষয়ে জানতে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের সঙ্গে মুঠোফেনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও বা বার্তা দেওয়া হলেও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি।

You may also like

Leave a Comment

যোগাযোগ

বার্তাপ্রেস একটি অনলাইনভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম। সত্য এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বার্তাপ্রেস পড়ুন, বার্তাপ্রেসে লিখুন। বার্তাপ্রেসের সঙ্গেই থাকুন।

ঠিকানা

© ২০২৫ | বার্তাপ্রেস কর্তৃক সর্বসত্ব ® সংরক্ষিত |